ময়দানের ঘাসের রঙ “ভালবাসা”

Share

Facebook
Twitter
WhatsApp

[fblike]

Author Smritimoy Guha

আনন্দবাজার পেপারে আজ মোটা হরফে লেখা হয়েছে—

কাল লীগের বড় ম্যাচ। যে জিতবে, সেই-ই চ্যাম্পিয়ান।

ঘটি-বাঙালের সেই শতাব্দী প্রাচীন লড়াই আজো চায়ের কাপে ঝড় তোলে।

বিকেলের আলো ফিকে হয়ে আসছে। চায়ের ঠেকে বসে রমেন হাতে নিলো আনন্দবাজার।

রমেনের চোখ থেমে গেল শিরোনামে।

সে ফুটবলটা খুব একটা খারাপ খেলতো না। একদিন ভেবেছিল মাঠেই হয়তো নিজের জায়গা খুঁজে পাবে। কিন্তু ভাগ্য কোনোদিনই তার সঙ্গ দেয়নি। প্লেয়ার হতে হতে শেষমেশ জুট ফ্যাক্টরির লেবার হয়ে যেতে হয়েছিল তাকে। আর কোভিডের সময় সেই চাকরিটাও হারালো।

ছ’মাস হলো সে বেকার। হাতে টাকার টানাটানি। আগে হাজার দশেক টাকা মাসমাইনে পেতো, আর এখন সবই শূন্য। সংসার বলতে বাকি আছে শুধু সে আর তার একমাত্র মা-হারা ছেলে।

ছেলের নাম রেখেছিল অমিতাভ। ভাবছিলো, নিজে যা হতে পারেনি, ছেলেকে তাই বানাবে। কিন্তু বিধি বাম। মা মারা যাবার পরেই ছেলেকে নিজের কাছে টেনে নিলো ঠাকুমা। তিন বছর পর অমিতাভ আবার ফিরেছে রমেনের ঘরে।

পেপার হাতে রমেন আবার হেডলাইনের দিকে তাকালো—কাল বড় ম্যাচ।

এতদিন যত কষ্টই হোক, বড় ম্যাচ মানেই মাঠে হাজির রমেন, নিজের প্রিয় দলের রঙ গায়ে মেখে। কিন্তু এবার? কম করে পাঁচশো টাকার খরচ। এখন আর সেই সামর্থ্য নেই।

রমেনের একটাই স্বপ্ন ছিল—ছেলে প্লেয়ার হবে। কিন্তু অমিতাভ মাঠে খেলতে ভালোবাসে না, শুধু খেলা দেখে আর কবিতা লেখে। তার কবিতার খাতায় একদিন রমেন খুঁজে পেয়েছিলো মায়ের ছবি। যে ছবি রমেন বিছানার পাশে রেখে দিত, তা ছেলে একবারও জিজ্ঞেস না করেই তুলে নিয়েছে। তাতে রমেনের মন খারাপ হয়েছিল।

পাশাপাশি দুজন দুজনকে এড়িয়ে চলে। কথা কম হয়। তবু রমেনের মনে হয়—অমিতাভ আজও মায়ের মৃত্যুর জন্য বাবাকেই দায়ী করে।

সেই দিনও ছিলো বড় ম্যাচ। রমেন মাঠে গিয়েছিল। ফিরে এসে দেখেছিল—সব শেষ। তারপর কবিতার খাতায় পড়েছিলো এই লাইনগুলোঃ

“স্থবিরতা গ্রাস করে মাঝে মধ্যেই। অপ্রকাশিত থেকে যায় কত বক্তব্য। শিথিলতা নেমে এলে ভালোবাসায়, আমি, যাত্রী বদলাতে চাই কখনো সখনো, মাঝরাস্তায়।”

মনে হয়েছিল কবিতাটা তাকে নিয়েই লেখা। হয়তো ছেলেও একদিন মায়ের মতো মাঝপথে ছেড়ে চলে যাবে।

ভালবাসা আর দ্বন্দ্বের টানাপোড়েনেই চলছে তার জীবন। এখন তার একটাই ইচ্ছে—ছেলে তাকে আজও “আপনি” করে ডাকে। অথচ রমেন মনে-মনে চায়, অমিতাভ যেন একদিন তাকে “তুমি” বলে ডাকে।

হঠাৎ নিমাইদার ডাকে সম্বিৎ ফেরে—

—”কিরে রমেন, কাল কখন বের হচ্ছিস? যাবি তো খেলা দেখতে?”

রমেন জানে, ছেলেরও প্রিয় দলের প্রতি একনিষ্ঠ ভালোবাসা আছে। ভাবলো—যাই হোক, আজই দুটো টিকিট নিয়ে বাড়ি ফিরবে। কাল বাপ-বেটা একসাথে মাঠে গিয়ে দলকে জিতিয়ে আনবে।

সে জিজ্ঞেস করলো—

—”দাদা, টিকিট কাটা হয়নি। হবে নাকি দুটো?”

নিমাইদা হেসে উত্তর দিল—

—”ডিমান্ড তো প্রচণ্ড। তবে তোদের কথা ভেবে আলাদা করে কিছু রেখেছি। তবে একশো টাকারটা দেড়শো লাগবে।”

রমেনের মাথায় হাত। এমনিই সংসারে খরচের চাপ। তবু মনে বললো, কুছ পরোয়া নেহি! আজ টিকিট কাটবেই।

সে বললো—

—”দাদা, দুশো এখন দিচ্ছি, বাকি একশো পরে।”

নিমাইদা রাজি হলো। রমেন বিজয়গর্বে হাতে টিকিট নিয়ে বাড়ি ফিরলো।

বাড়ির সামনে আলো জ্বলছে। বুঝলো, ছেলে বাড়িতে আছে। ভাবলো—কালকের টিকিটের খবর শুনে অমিতাভ হাসবে। সেই হাসির ছবি মনে করতেই মন ভরে গেল।

কিন্তু ঘরে ঢুকতেই ছেলে বলে উঠলো—

—”বাবা, কবে থেকে আপনাকে বলছি একটা জার্সি কিনে দিন! আপনি পারলেন না। কাল আমি বন্ধুদের সাথে কি পরে খেলা দেখতে যাব?”

রমেন থমকে গেল। সত্যিই তো, ছয় মাস ধরে ছেলে জার্সির কথা বলছে। কিন্তু সংসারের হাল দেখে সেটা তার মাথাতেই আসেনি।

সে জিজ্ঞেস করলো—

—”কতো লাগবে?”

ছেলে উত্তর দিল—”পাঁচশো।”

পকেটে হাত দিল রমেন। মেলাতে পারলো মাত্র ২৫০ টাকা।

—”তুমি একটু অপেক্ষা করো,” বলেই বেরিয়ে গেল সে।

পাড়ার মোড়ে দাঁড়িয়ে ভাবলো—যদি টিকিট দুটো বিক্রি করা যায়! শেষমেশ বিক্রি হলো চারশো টাকায়। একশো ফেরত দিল নিমাইদাকে। বাকিটা হাতে নিয়ে বাড়ি ফিরলো।

ছেলের হাতে তুলে দিল পাঁচশো টাকা। বললো—

—”যাও, কিনে নিয়ে আসো জার্সিটা।”

আজ রমেনের ঘুম থেকে ওঠার কোনো তাড়া নেই। ভাবলো, এভাবেই শুয়ে থাকবে।

সকাল ৮টা, মাথার ওপর সূর্য খেল দেখানো শুরু করেছে।

হঠাৎ সে শুনতে পেলো ছেলে ডাকছে—

– “বাবা… বাবা!”

লাফিয়ে উঠে বাইরে এলো রমেন।

– “কি হয়েছে রে?”

ছেলে বললো—

– “বাবা, এটা দেখো তো!”

রমেন বিস্ময়ে চেয়ে দেখলো—এক জোড়া নতুন চটি!

তার পুরনো চটিটা তো অনেকদিন ধরে ছেঁড়া ছিল, কিন্তু নতুন কিনতে টাকা খরচ করতে সে চায়নি।

– “এটা কিনলি কোথা থেকে?”

ছেলে গর্বিত গলায় বললো—

– “কাল একটা ছোট চাকরি পেয়েছি বাবা। ওরা কিছু অগ্রিম দিয়েছে। খবরটা তোমাকে দেবো বলেই বাড়ি আসছিলাম।”

তোমাকে বললো ছেলে, এটা শোনার জন্যই তো এত দিন সে অপেক্ষা করেছিল অমিতাভ বলেই চল্লো- দেখলাম তুমি নিমাই কাকার দোকানে দাঁড়িয়ে টিকিট বিক্রি করছো। ব্যাস, আর কি! কাল তোমার থেকে যে ছেলেটা টিকিট কিনলো সে আমারই বন্ধু, নাম সলিল, এই নাও নতুন জার্সিটা পরে নতুন চটি পায়ে চলো আজ বাপ ছেলে মিলে জিতিয়ে আসি।

রমেনের মুখ দিয়ে আর কথা বের হলো না। শুধু ছেলেকে জড়িয়ে ধরলো। মনে হলো কেউ পেছন থেকে বলছে—

– “রমেন, ব্যালেন্সটাই আসল বুঝলি। ব্যালেন্সটা হারাস না, তাহলেই সামনের প্লেয়ার তোকে বিট করে চলে যাবে।”

রমেন মনে মনে উত্তর দিলো—

– “স্যার, আমি ব্যালেন্সটা হারাইনি।”

ঠিক তখনই রমেনের ফোন বেজে উঠলো।

– “আরে, বাপি ফোন করছে!”

বাপি তার সহকর্মী, রাতের আড্ডারও সঙ্গী। ফোন ধরতেই ওপাশ থেকে ভেসে এলো—

– “রমেন দা, আজ যাচ্ছো তো? তোমার নাম্বার কতো?”

রমেন হকচকিয়ে বললো—

– “কিন্তু… তোর বাবার তো খুব অসুস্থতা! ICU তে ভর্তি?”

এবার বাপির মনে পরতে লাগলো প্রায় বছর ২০ আগে বাবার হাতটা ধরে সে চলেছে লেসলি ক্লেদিয়াস ধরে। খুব ভীড়, বাবার কাধে এক্ষন সে, খেলা ৯০ মিনিট চোলছে, এইতো বল নিয়ে এগিয়ে চলেছে বাইচুং, সামনে একটা ছোট টোকায় বলটা দিলো তুষারকে, তুষারের একটা ছোট ওয়াল প্লেয় আর গোল। বাবা তাকে কাধে নিয়ে নাচ্ছে আর বলছে “হারার আগে হারুম না বুঝছো, আমাগো রক্তে লড়াই”। রমেন আবার বল্লো “বাপি হ্যালো”

বাপির গলা কেঁপে উঠলো, কিন্তু দৃঢ় শোনালো—

– “হ্যাঁ দাদা, ঠিকই শুনেছো। কিন্তু বাবার কানে কানে আমি বলেছি মতি বাবুর সেই বাণীটা—

‘ফাইট বাবা ফাইট, আমার আবার আসতে কম করে দশ ঘন্টা লাগবে, এর মধ্যে হারা চলবে না, আমাদের রক্তে কিন্তু লড়াই। উনি আমাকে কথা দিয়েছেন আমি না ফেরা পর্যন্ত উনি কোন মতেই হারবেন না। চলো দাদা এখন না বেরোলে লেট হয়ে যাবো,

অন্যদিকে সুশান্ত ঠিক করেছে বাপিকে একা ছাড়বে না।

১:৩০-এ তার ট্রেন নামবে, সেখান থেকেই সোজা যুবভারতী।

কিন্তু ছুটি নেবে কিভাবে? সল্টলেকের অফিসের আটতলায় দাঁড়িয়ে অনেক সাহস নিয়ে ম্যানেজারের ঘরে ঢুকলো সে।

– “স্যার, আমার ঠাকুমা মারা গেছেন। আজ দুপুরে ছুটি লাগবে।”

ম্যানেজার হেসে বললো—

– “এই নিয়ে দু বছরে কতোবার ঠাকুমাকে মারলি! জানি আজ বড় ম্যাচ দেখতে যাবি। ঠিক আছে, তবে শর্ত আছে—প্রতি দশ মিনিট পরপর আমাকে হোয়াটসঅ্যাপে স্কোর পাঠাতে হবে।”

সুশান্ত হেসে ফেললো।

– “ওকে স্যার, মিস হবে না।”

সবাইয়ের অগোচরে রমা বসে আছে ঘরে একা।

প্রেম ভাঙার যন্ত্রণা তাকে কুরে কুরে খাচ্ছে। মনে হচ্ছে—এই জীবনের আর মানে কি?

হঠাৎ চোখে পড়লো একটি মেসেজ—

– “আজকের আল্ট্রাস গ্যালারির প্রোগ্রামটা তোকেই লিড করতে হবে, তাড়াতাড়ি চলে আয়।”

আলমারি থেকে নিজের প্রিয় জার্সি বের করে তাতে চুমু খেলো।

নিজেকেই বললো—

– “সত্যিকারের ভালোবাসা তো এটাই। এটা ছেড়ে আমি কোথায় যাবো!”

তারপর গলা ছেড়ে চিৎকার করলো—

– “জয়…!!”

এরকম হাজার হাজার চরিত্র প্রতিদিন ময়দানে খেলা দেখতে যায়, সুখ দুঃখ ভাগ করে নেয়। অনেক সময় রক্তের সম্পর্ক থেকেও এরা বেশি আপন হয়ে যায় জীবনে।

পুনশ্চঃ যে যে দলের সমর্থক সে সেই দলের রংটা এই লেখার সঙ্গে বসিয়ে নেবেন কারণ পৃথিবীর সব ক্লাবের সমর্থকেরাই এরকম আবেগপ্রবণ।

ছবিটি প্রতীকী মাত্র, এর সঙ্গে গল্পের কোনো প্রত্যক্ষ যোগ নেই

Tribute to Moti Nandy

In Picture: Master Pranish Bhattacharya & Mr. Joydeep Bhattacharya

League Table

PosClubPWDLFAGDPts
1Hyderabad FC129122471728
2Mumbai City FC1183032112127
3ATK Mohun Bagan127231712523
4Kerala Blasters FC117131914522
5FC Goa126152016419
6Odisha FC116141515019
7Chennaiyin FC114252123-214
8East Bengal114071320-712
9Bengaluru FC12318817-910
10Jamshedpur FC11128819-115
11NorthEast United FC1210111033-233

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.