কাপ বাড়ির দরজা থেকে ফিরে গেল। অশ্বমেধের ঘোড়ায় চড়ে ২০১৮ বিশ্বকাপ সেমিফাইনালিস্টদের ঘরের দরজা থেকে কাপ ছিনিয়ে নিয়ে গেল ২০১৮-এর বিশ্বকাপ বাড়িতে বসে দেখা ইতালীয়রা।
পঞ্চান্ন বছর পর কোনো বড়ো টুর্নামেন্টে জেতার হাতছানি, তাও আবার ওয়েম্বলি স্টেডিয়ামে (Wembley Stadium)। গত ২৯শে জুন জার্মানিকে হারানোর পর থেকে স্বপ্ন দেখার উৎসব শুরু হয়েছে ইংল্যান্ড জুড়ে। উত্তেজনা এতটাই চরমে পৌঁছোয় যে বিনা টিকিটের দর্শক স্টেডিয়ামে ঢুকছে বলেও খবর ছড়িয়ে পড়ে। রাস্তায় রাস্তায় সমর্থকদের উন্মাদনা। প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য অতিরিক্ত ৪৫ মিনিট পাব খোলা থাকার অনুমতি আর স্কুল পড়ুয়াদের জন্য সোমবার দেরি করে স্কুল শুরুর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। ইংল্যান্ডের রানী এলিজাবেথ (Queen Elizabeth II) এবং বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন (Boris Johnson) তাদের ফুটবল দলের সমর্থনে বিশেষ বার্তা পাঠিয়েছিলেন। ৯০,০০০ দর্শকাসনের ওয়েম্বলিতে ষাট হাজার দর্শকের সমারোহ, যার সিংহ ভাগটাই তিন সিংহের (The Three Lions) সমর্থনে গলা ফাটাতে উদগ্রীব।
যদিও জার্মান চ্যান্সেলর অ্যাঞ্জেলা মের্কেল (Angela Merkel) এবং ইতালীয় প্রধানমন্ত্রী মারিও দ্রাঘি (Mario Draghi) কুন্ঠা প্রকাশ করেছিলেন ইউরোর দর্শক সমারোহে ডেল্টা প্রজাতির (Delta variant) কোভিড সংক্রমণ নিয়ে, কাপ ঘরে আনার নেশায় বুঁদ লন্ডনের মেয়র সাদিক খান (Sadiq Khan) সেসব অগ্রাহ্য করেন, কারণ তিনি করোনা পরিস্থিতি মোকাবিলা নিয়ে অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসী। সপরিবার প্রিন্স উইলিয়াম (Prince William) থেকে ডেভিড বেকহ্যাম (David Beckham) এসেছিলেন মাঠে। ব্রেক্সিট (Brexit) পরবর্তী যুগে ঐতিহাসিক দিন হতে পারতো ১১-ই জুলাই। কিন্তু এত আয়োজন, আড়ম্বর বৃথা গেল। এই বিষাদঘন পরিণতির জন্য প্রস্তুত ছিল না ইংল্যান্ড।
অন্যদিকে তেত্রিশ ম্যাচ অপরাজিত থাকার জাতীয় রেকর্ড নিয়ে দ্বিতীয় ইউরো জেতার লক্ষ্যে ফাইনালে নামে আজুরিরা (Gli Azzurri)। ম্যানচেস্টার সিটির (Manchester City F.C.) প্রাক্তন কোচ রবের্তো ম্যানচিনির (Roberto Mancini) প্রশিক্ষণাধীন এই ইতালি টিকিটাকা, লম্বা বল এবং প্রেসিং ফুটবলের একটি অসাধারণ মিশ্রণ প্রদর্শন করলো গোটা ইউরো ২০২০ (UEFA EURO 2020) জুড়ে। ইতালির প্রথম একাদশ একই থাকলেও, ইংল্যান্ড তুলনায় বেশি রক্ষণাত্মক ত্রিপিয়েরকে (Kieran Trippier) নিয়ে এসেছিলো টুর্নামেন্টে চমৎকার ফর্মে থাকা বুকায়ো সাকার (Bukayo Saka) জায়গায়।
শুরুটা স্বপ্নের মতোই হয়েছিল ইংল্যান্ডের। খেলা শুরুর দু মিনিটের মধ্যে ফিরতি আক্রমণে গোল করে এগিয়ে দেন লুক শ’ (Luke Shaw)। ইউরো কাপ ফাইনালের ইতিহাসে দ্রুততম গোল। ত্রিপিয়েরের ক্রস দূরের পোস্টে একদম অসংরক্ষিত অবস্থায় খুঁজে পায় শ’কে। চলতি বলেই নেওয়া শট বার ছুঁয়ে গোলে ঢুকে যায় টুর্নামেন্টের সেরা খেলোয়াড় নির্বাচিত হওয়া ডোনারুমাকে (Gianluigi Donnarumma) দাঁড় করিয়ে রেখে (১-০)।
এরপর থেকে খেলার প্রথমার্ধে তিন সিংহের (The Three Lions) গর্জন ইউরোপের দ্বিতীয় বৃহত্তম স্টেডিয়াম ওয়েম্বলিতে উপচে পড়ছিলো। বিরতির আগে পর্যন্ত খেলার দখল ছিল ইংরেজদের পায়েই। ইতালির মাঝমাঠ এবং রক্ষণ ভীষণ অবিন্যস্ত ছিল। ফর্মেশন ভেঙ্গে যাচ্ছিলো বারবার। ইতালির রক্ষণের বর্ষীয়ান প্রহরী যুগল, জর্জিও কিয়েলিনি (Giorgio Chiellini) এবং লিওনার্দো বোনুচ্চিকে (Leonardo Bonucci) অসহায় লাগছে তখন। স্পিনাজোলার (Leonardo Spinazzola) না থাকাটা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাড়াচ্ছিলো। এমার্সন (Emerson Palmieri) তার শূন্যস্থান পূরণ করতে ব্যর্থ। জর্জিনিয়ো (Jorginho) এবং ভেরাত্তিকে (Marco Verratti.) ছাপিয়ে গিয়েছিলেন ইংল্যান্ডের মাঝমাঠের খেলোয়াড়রা। কিয়েসা (Federico Chiesa) চেষ্টা করে গেলেও ফিলিপ্স (Kalvin Phillips) বা দেকলান রাইস (Declan Rice) কখনোই ইতালির আক্রমণের প্রাণ-ভোমরা ইনসিগ্নেকে (Lorenzo Insigne) স্বচ্ছন্দে থাকতে দেননি। কড়া মার্কিং-এর চক্রব্যূহে ৫ ফুট ৪ ইঞ্চির প্লেমেকার বক্সের আশেপাশে রীতিমতো হাঁসফাঁস করছিলেন। ডান প্রান্তে বারেল্লাও (Nicolò Barella) বেশ নিস্পৃহ ছিলেন। সেই সুযোগে দাপিয়ে বেড়ান শ’, রাইস, ফিলিপ্স, মেসন মাউন্টরা (Mason Mount)। যদিও তারা রক্ষণ সামলেই আক্রমণে যাবার পক্ষপাতী ছিলেন। জন ষ্টোনসের (John Stones) নেতৃত্বে ইংলিশ রক্ষণ দুর্ভেদ্য হয়ে উঠেছিল।
দ্বিতীয়ার্ধে চাপ বাড়াতে থাকে ইতালি। পঞ্চান্ন মিনিটে তেমন দাগ না কাটতে পারা বারেল্লা এবং সিরো ইম্মোবিলের (Ciro Immobile) জায়গায় মাঠে আসেন ক্রিস্টান্তে (Bryan Cristante) এবং বেরার্দি (Domenico Berardi)। ইনসিগ্নে এবং সেমিফাইনালের সেরা খেলোয়াড় কিয়েসার নেতৃত্বে এক প্রত্যয়ী ইতালিকে খুঁজে পাওয়া যায় এই সময়। এমার্সনের জন্মের দেশ ব্রাজিল কোপা ফাইনালে হেরে গেলেও, ২০১৮-তে ইতালীয় নাগরিকত্ব নেওয়া এই লেফট ব্যাক দ্বিতীয়ার্ধে অনেক বেশি সপ্রতিভ হয়ে ওঠেন। চেলসির (Chelsea F.C.) হয়ে খেলা তরুণ বাম দিকে ভরসা দিতে থাকেন ইনসিগ্নেকে। ভ্যারেত্তি এবং কিয়েসা চলে আসেন বেশ খানিকটা মাঝখানে। জেতার অঙ্গীকার নিয়ে ব্রিটিশ বক্সের চার ধারে তারা অনেক বেশি জায়গা তৈরী করতে থাকে, এবং আশ্চর্য্য ভাবে ব্রিটিশ রক্ষণ লোক বাড়িয়ে ক্রমশ অনেক গভীরে নোঙ্গর ফেলবার চেষ্টায় থাকে।
প্রথমার্ধে ইতালির রক্ষণকে বিভ্রান্ত করা হ্যারি কেনের (Harry Kane) বুদ্ধিদীপ্ত পাস হোক বা মাউন্ট এবং স্টার্লিং (Raheem Sterling) -এর দৌড়, ইংল্যান্ড আক্রমণভাগের ত্রয়ী একদম হারিয়ে যায় খেলা থেকে। স্টার্লিং বেশ কয়েকবার গড়াগড়ি খেলেও, সেমিফাইনালের বিতর্কিত পেনাল্টির পর ডাচ রেফারি বর্ণ কুইপার্স (Bjorn Kuipers) সেগুলোতে খুব একটা দৃষ্টিপাত করেননি। ম্যাচ পরিচালনার ক্ষেত্রে কোনো অভিযোগের সুযোগ রাখেননি। ভ্যারের (VAR check) দরকারও পড়েনি গোটা ম্যাচে।
সাতান্ন মিনিটে ইনসিগনের শট কাছের পোস্টে প্রতিহত করেন পিকফোর্ড (Jordan Pickford)। বাষট্টি মিনিটে ফেডেরিকো কিয়েসার মাটি ঘেঁষা শট অনবদ্য ক্ষিপ্রতার সাথে বাঁচান ইংল্যান্ড জার্সিতে গর্ডন ব্যাঙ্কসের (Gordon Banks) সবচেয়ে বেশি সময় গোল না খাওয়ার রেকর্ড ভেঙ্গে দেওয়া পিকফোর্ড। পাঁচ মিনিটের মধ্যেই গোল করেন লিওনার্দো বোনুচ্চি (Leonardo Bonucci)। কর্নার থেকে জটলার মধ্যে ভেরাত্তির গোলমুখী হেড কোনো রকমে ইংল্যান্ড গোলরক্ষক বাঁচালেও, বল পোস্টে ধাক্কা খেয়ে চলে আসে বোনুচ্চির পায়ে (১-১)। সবচেয়ে বেশি বয়েসে ইউরো কাপের ফাইনালে গোল করার রেকর্ড করলেন জুভেন্তাসের (Juventus F.C.) ৩৪ বছর ৭১ দিন বয়েসী সেন্টার ব্যাক।
এরপরেই সাকাকে নিয়ে আসেন গ্যারেথ সাউথগেট (Gareth Southgate)। ইংল্যান্ড আবার চারজনের রক্ষণে ফিরে যায়। এরপরেই আসেন হেন্ডারসন (Jordan Henderson) ক্লান্ত রাইসের জায়গায়। কিন্তু লাভ কিছু হয়নি। জ্যাক গ্রিলিশ (Jack Grealish) পরিবর্ত হিসেবে নেমে দুরন্ত এবং কার্যকরী ফুটবল উপহার দিলেও, কেন তাকে ১০০ মিনিট অবধি নামানো হয়নি, তার ব্যাখ্যা পাওয়া দুষ্কর। যেমন রাশফোর্ড (Marcus Rashford) এবং জ্যাডন স্যাঞ্চো-কে (Jadon Sancho) নামানো হলো অতিরিক্ত সময়ের প্রায় শেষ মিনিটে। এই দুজন তরুণ ম্যাঞ্চেস্টার ইউনাইটেডের (Manchester United) খেলোয়াড়কে নামানোই হয় শুধুমাত্র টাইব্রেকার নেবার উদ্দেশ্যে। দুজনেই মিস করলেন। আরেকটু সময়ের বেশি জন্য তাদের মাঠে নামানো হলো না কেন এই প্রশ্ন তুললেন ভাইচুং ভুটিয়া (Bhaichung Bhutia)। খুব স্বাভাবিক, উঠবেই।
১৯৭৬ সালের পর এটি-ই দ্বিতীয় ইউরো যাতে টাইব্রেকারের মাধ্যমে মীমাংসা হলো অন্তিম ম্যাচের। টাইব্রেকারে ইতালির হয়ে বেরার্দি, বোনুচ্চি এবং বার্নারদেসচি (Federico Bernardeschi) বল জালে জড়ান। দ্বিতীয় পেনাল্টি থেকে গোল করতে ব্যর্থ হন বেলোত্তি (Andrea Belotti), দৃশ্যতই চাপে ছিলেন তিনি। ইংল্যান্ডের হয়ে প্রথম দুটি শটেই গোল করেন হ্যারি কেন এবং হ্যারি ম্যাগুয়ের (Harry Maguire)। তৃতীয় শটে ডোনারুমাকে উল্টো দিকে পাঠিয়েও বল পোস্টে মারেন রাশফোর্ড এবং স্যানচোর চতুর্থ শট বাঁচিয়ে দেন এসি মিলানের (A.C.Milan) গোলরক্ষক। পেনাল্টি বিশেষজ্ঞ জিওর্জিনিয়োর পঞ্চম শট পিকফোর্ড রুখে দিয়ে ব্রিটিশদের আশা বাঁচিয়ে রাখেন। কিন্তু শেষ শট ডোনারুমার হাতে মারেন ঊনিশ বর্ষীয় সাকা। প্রবল স্নায়ুর চাপ সামলাতে পারেননি তিন তরুণ ফুটবলার। অনভিজ্ঞ সাকাকে অতি-গুরুত্বপূর্ণ শেষ শট মারতে পাঠাবার ঝুঁকি নেবার সিদ্ধান্তের দায়ভার নিজের উপর নেন সাউথগেট। সাউথগেটের টাইব্রেকারের অভিশাপ ঘুচলো না। বিশ্বকাপ আর ইউরোকাপ মিলিয়ে ইংল্যান্ড মাত্র বাইশ শতাংশ টাইব্রেকার জিতেছে। অপর দিকে ডোনারুমা ক্লাব এবং দেশের হয়ে পাঁচটা টাইব্রেকারের পাঁচটিতেই বিজয়ী হলেন।
বর্ণবৈষম্যের বিরুদ্ধে লড়াইতে প্রতি ম্যাচের শুরুতেই হাঁটু মুড়ে বসে প্রতিবাদ জানিয়েছেন ইংল্যান্ডের ফুটবলাররা। কিন্তু, পেনাল্টি মিসের কারণে দুর্ভাগ্যক্রমে তিন কৃষ্ণাঙ্গ খেলোয়াড়কেই সামাজিক মাধ্যমে বর্ণবৈষম্যমূলক আপত্তিজনক মন্তব্যের শিকার হতে হচ্ছে। যার তীব্র নিন্দা জানিয়ে তদন্তের দাবী জানিয়েছে এফ এ (FA)। সমর্থকদের উচ্ছৃঙ্খলতার জন্য কুখ্যাত ব্রিটিশ ফুটবল। তাদের উন্মাদনায় কালিমালিপ্ত হয়েছিল ইংল্যান্ডের সেমিফাইনাল জয়।
ইতালির অধিনায়ক কিয়েলিনি ম্যাচের শেষে হেঁয়ালি করে বলেন আমি জিয়ানলুইজি বুফোঁর (Gianluigi Buffon) সাথে খেলেছি, আর আমি এখনো জিয়ানলুইজি বুফোঁর সাথেই খেলি। ইতালীয় কিংবদন্তী গোলরক্ষকের উত্তরসূরি আরেক জিয়ানলুইজির বিশ্বস্ত দস্তানা জোড়ার ভরসায় ইউরো কাপ ২০২০ গেল রোমে (It’s going to Rome!)। দীর্ঘ তিপ্পান্ন বছর বাদে।